Header Ads

Header ADS

মাযহাবের গোড়ার কথা : হাকীমুল ইসলাম ক্বারী মুহাম্মদ তাইয়েব ছাহেব রহঃ

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক:  মাযহাব ও তাকলিদের বিষয়টি কোন হাল্কা বিষয় নয়। বরং এটি একটি ইলমি বিষয়। এই বিষয়ক আলোচনা – পর্যালোচনা উলামায়ে কেরামের মাঝে সীমাবদ্ব থাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কী করা যাবে, অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এই নিরেট ইলমি বিষয়কেও সাধারণের আলোচনায় ওয়াজ- মাহফিলে টেনে আনা হয়েছে। এবং মাযহাব – অনুসারী ও মাযহাব – বিরোধী উভয়পক্ষই এমন কুৎসিত কূটতর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন যে, ভদ্র মানুষের কান এ আলোচনা শুনতে গেলে লজ্জায় লাল বর্ণ ধারণ করে।
লেখক পরিচিতি-
হাকিমুল ইসলাম ক্বারী তাইয়েব ছাহেব রহঃ কে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তার প্রাজ্ঞনোচিত ও প্রান্তিকতামুক্ত বয়ানের জন্য তিনি বিখ্যাত। বইঘর প্রকাশনী ৬ খন্ডে সমাপ্ত তার বক্তৃতামালার বঙ্গানুবাদ ছেপেছে অনেক বছর আগেই। যা সচেতন পাঠকবর্গের অজানা নয়। বক্ষ্যমাণ ছোট্ট কলেবরের গ্রন্থটিও তার একটি বক্তৃতার অনুবাদকর্ম। অনুবাদ করেছেন আমার উস্তাদ মাওলানা মুহাম্মদ জালালুদ্দিন দাঃ বাঃ। এই বক্তৃতাটি তিনি ১৩৬৩ হিজরীতে ইন্ডিয়ার ইউ.পি প্রদেশের এলাহাবাদ জেলায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া আহনাফ কনফারেন্সে প্রদান করেছিলেন। সেই কনফারেন্সে বিভিন্ন মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় শাখা সম্প্রদায় যেমন আহলে হাদিস জামাতের প্রতিনিধিগণ ও উপস্থিত ছিলেন।
পাঠ- পর্যালোচনা-
এই গ্রন্থে তিনি কুরআন – হাদীদের বিশুদ্ব রেফারেন্সে ও সুস্থ যুক্তি-বুদ্বির আলোকে তাকলীদ ও ইজতিহাদ বিষয়ক আলোচনার অবতারণা করেছেন। এবং শুধু এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে; নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণসমৃদ্ব কোনো ইজতিহাদের তাকলীদ করা বিদআত নয় যে, একে তিরষ্কারযোগ্য মনে করা হবে। বরং এটি অতীতের সালাফ থেকে আরম্ভ করে বর্তমানের খালাফ পর্যন্ত দ্বীনের স্বীকৃত পথ বলে পরিগণিত। তাকলিদ অস্বীকারকারীদের সাথে বাহাছ করা বা দালীলিক যুদ্ব করা থেকে তিনি বিরত থেকেছেন। আর স্রেফ মাযহাবের অপরিহার্যতা, দালীলিক ও যৌক্তিকভাবে স্বীয় হাকীমানা উসলুবে তুলে ধরেছেন। সেমতে তিনি একেবারে গোড়া থেকে আলোচনা শুরু করেছেন। ইজতিহাদের তত্ত্ব ও প্রকারভেদ আলোচনা করেছেন সংক্ষেপে, অতঃপর ইজতিহাদের মাধ্যমে কীভাবে শরীয়তে শৃঙ্খলা বজায় থাকে, তা বিস্তারিতভাবে নস (কুরআন – হাদীসের মূলভাষ্য) ও ইল্লত (কার্যকারণ) বর্ণনার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। এছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি তাকলীদের প্রচলন ছিল এর কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ইজতেহাদের সীমারেখা ও ইজতেহাদের অপব্যবহারের কুফল সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ বিবরণ পেশ করেছেন।
‘ইমামগণের মতবিরোধ রহমতের কারণ’ শিরোনামের আলোচনাটি সংক্ষেপ হলেও উপকারী। তারপর তাকলীদে শখসী নিয়ে কিছু আরয করার পর পরিশেষে ‘সালাফের মধ্যে নির্দিষ্ট তাকলীদ ছিল ব্যাপক আকারে’ –এই শিরোনামে তুলনামূলক লম্বা আলোচনা করেন।
হাকিমুল ইসলামের অন্যান্য রচনার মত এই রচনাও তাত্ত্বিক ও কিছুটা জটিলগোছের। কারো কাছে কিছু কিছু আলোচনা তত্ত্বের কচকচানি মনে হতে পারে। বস্তুত এই গ্রন্থ ‘কলসির ভেতর সাগর ভরে দেওয়া’ – র বাস্তব নমুনা। আর স্বভাবতই এজাতীয় দালীলিক গ্রন্থগুলো জটিল সব তাত্ত্বিক আলোচনায় ভরপুর থাকে। উপরন্তু যদি ছোট্ট কলেবরের হয় এবং উসূলে ফিকহের নানা পরিভাষার ব্যবহার করা হয়, তাহলে তো যেন দুর্বোধ্যতা আরো বেড়ে যায়।
যাই হোক, উল্লিখিত বইয়ের ২৪ পৃষ্ঠায় নিম্ন হাদিসটি আনা হয়েছে-
হাদীসের অর্থ- যে ব্যক্তি নিজের ইলম অনুপাতে আমল করে, আল্লাহ তা’আলা তাকে এমন ইলম দান করেন, যা তার নিকট ছিল না।
বিশুদ্ব মতানুসারে এটি হাদিস নয়। এর নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। যে সূত্রে তা বর্ণিত হয়েছে হাদীস বিশারদগণের নিকট তা জাল ও বানোয়াট।
বিস্তারিত দেখুন- ‘এসব হাদীস নয়’, দ্বিতীয় সংস্করণ, খন্ড নং- ২, পৃষ্ঠা নং- ৬২, রচনায়ঃ মাওলানা হুজ্জাতুল্লাহ দাঃ বাঃ। তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনায়ঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক দাঃ বাঃ।
এমনিভাবে উক্ত গ্রন্থের ৪০ পৃষ্ঠায় একটি রেওয়ায়াত এমন নকল করা হয়েছে-
“আমার উম্মতের আলেমগণ বনী ইসরাঈলের নবীতুল্য।”
বিশুদ্ব মতানুসারে এটিও হাদীসরূপে গ্রহণযোগ্য নয়। হাদীসের ভাণ্ডারসমূহে অনুসন্ধান করলে হাদীস হিসেবে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
দেখুন- ‘এসব হাদীস নয়, দ্বিতীয় সংস্করণ, খন্ড নং-১, পৃষ্ঠা নং- ৯১, রচনায়ঃ মাওলানা মুতীউর রহমান দাঃ বাঃ। তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনায়ঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক দাঃ বাঃ।
আমার চোখে বইটিতে এছাড়া আর বড় কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়ে নি।
উপসংহার-
বইটির উপসংহারে হাকিমুল ইসলামের দরদমাখা আবেদন যে কোনো বিবেকবান মুসলিমের – চাই সে মাযহাবী হোক বা লা – মাযহাবী, হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।

“এ জন্যে আমার বেদনাবিধুর আবেদন এই যে, মুকাল্লিদ ও গাইরে মুকাল্লিদ সকলে মাসআলাকে মাসআলার স্তরে রেখে মূল দ্বীনের সংরক্ষণে সম্মিলিত চেষ্টা- ফিকির করুন। সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকে চলে আসা মতবিরোধপূর্ণ শাখা মাসআলাসমূহের ক্ষেত্রে একদিকের অনুসারীদের পক্ষ থেকে এ প্রমাণকে যথেষ্ট মনে করুন যে, অমুক শ্রেণী অমুক ফকীহের ফতওয়ার উপর আমল করছে এবং তারা কোনো বিদআতপন্থী নয়। প্রত্যেক যুগে এ ধরণের মাসআলার ক্ষেত্রে এই প্রমাণকে ঝগড়া নিরসনের জন্যে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে; ঝগড়া উৎপাদনকারী মনে করা হয় নি। এ জন্যে আল্লাহর ওয়াস্তে আজও এই প্রমাণকেই ঝগড়া নিরসনকারী করুন; ঝগড়া উদ্রেককারী করবেন না। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পুরো মুসলিম জাতির বিনির্মাণের ফিকির করা প্রয়োজন এবং সকলে সম্মিলিতভাবে এমন কর্মপন্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা সকল মুসলমানকে এক মঞ্চে নিয়ে আসবে এবং ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্রসমূহের কিছুটা হলেও প্রতিরোধদ করতে সক্ষম হবে।
সুধীমণ্ডলী ! নিজেদের পারস্পরিক ঐক্য সাধনে কমপক্ষে হযরাতে সাহাবায়ে কেরামের এই অনুপম আদর্শকে আলোকমিনার বানানো উচিত যে, কতক সাহাবীর নিকট কুরআনে কারীমের এমন কিছু ‘শায’ আয়াত ছিল, যেগুলোকে তারা ইজমার বিপরীতে কুরআনের অংশ বলে জানতেন, অথচ সাহাবায়ে কেরামের ইজমা সেগুলোকে কুরআনের অংশ বলে স্বীকার করে নি। কিন্তু কোনো বর্ণনার মাধ্যমেই এ কথা প্রমাণিত নয় যে, ইজমাওয়ালারা ইজমাবিরোধীদের বিপক্ষে কিংবা ইজমাবিরোধীরা ইজমাওয়ালাদের বিপক্ষে কোনো কুরুক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিলেন।
মুকাল্লিদগণ যেহেতু তাকলীদ না করাকে ইজমার পরিপন্থী মনে করেন, তাই তারা তাকলীদ পরিত্যাগকারীদের বিষয়ে ঐ সমস্ত সাহাবার আদর্শ গ্রহণ করুন, যারা নিজেদের ইজমা সত্ত্বেও ইজমাবিরোধীদের বিরুদ্বে কোনো কুরুক্ষেত্র সৃষ্টি করেন নি বা কোনরূপ যুদ্ব – বিগ্রহ আরম্ভ করেন নি। বরং যথাযথভাবে বোঝানোর পর তাদের গবেষণা অনুপাতে তাদেরকে মাযুর মনে করে সবসময় ছেড়ে দিয়েছেন।
অপরদিকে তাকলীদ অস্বীকারকারীগণ উম্মতের ইজমা সত্ত্বেও যদি তাকলীদকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেন, তাহলে তারা ঐ সব সাহাবার পথ অবলম্বন করুন, যারা ‘শায’ আয়াতের বিষয়ে নিজেদের তাহকীককে পরিত্যাগ করেন নি, আবার ইজমাওয়ালাদের বিরুদ্বে লড়তেও আসেন নি; বরং তাদেরকে তাদের আমলের উপর স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়েছেন। তাকলীদ বিষয়ক উভয় দল, বরং ইসলামের সমস্ত দল যতক্ষণ পর্যন্ত সাহাবায়ে কেরামের উদারতার এ আদর্শ অবলম্বন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত উম্মতের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান হওয়া কখনোই সম্ভব নয়।”
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রান্তিকতামুক্ত দ্বীনে হানিফ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমীন।

• বই- মাযহাবের গোড়ার কথা
• মূল- হাকীমুল ইসলাম ক্বারী মুহাম্মদ তাইয়েব ছাহেব রহঃ
• অনুবাদ- মাওলানা জালালুদ্দিন দাঃ বাঃ
• প্রকাশনায়- মাকতাবাতুল আশরাফ
• প্রকাশ কাল- সেপ্টেম্বর ২০১৫ ঈসায়ী
• মূদ্রিত মূল্য- ১০০ টাকা
• পৃষ্ঠা সংখ্যা- ৯৬

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.