Header Ads

Header ADS

সনাতন হিন্দুধর্ম ও ইসলাম [যুক্তি ও প্রমাণ্যতার নিরিখে] : মাওলানা উবায়দুল্লাহ মালিরকোটলায়ী রহঃ

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক: বইটির প্রথম পৃষ্ঠা উল্টাতেই ভিতরে অনুদিত নামের নিচে চার লাইনের একটি লেখা। 'বুটা সিং নামের এক শিখ তরুণ মাত্র বারো বছর বয়সে এ বইটি অধ্যয়ন করে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। সেই তরুণ আজকের ইতিহাসে ইমামে ইনকিলাব মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি নামে চির স্মরণীয় হয়ে আছে।'

প্রাথমিক ধারণামূলক লাইন ক'টি পড়ার পর একজন পাঠকের পক্ষে নির্বিকারভাবে বইটি রেখে দেয়ার কোন অবকাশ নেই।


আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগেকার কথা। ভারতের পায়েল নগরীতে জন্ম নেয়া যুবক অনন্ত রাম। পৈত্রিকভাবে হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও সেই ধর্ম সম্পর্কে যতই জানছেন, ততই তার অনাস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। ধর্মের সাথে আত্মিক প্রশান্তি জড়িত। পৈত্রিক ধর্মে আত্মিক প্রশান্তির পরিবর্তে তার মাঝে অশান্তি বাড়ছে। সিদ্ধান্ত নিলেন, সবগুলো ধর্ম পড়ে, জেনে এবং যাচাই করে তারপর সত্যটিকে অনুসরণ করবেন। সেই অনুসন্ধান থেকে যুবক অনন্ত রাম হয়ে উঠলেন উবায়দুল্লাহ। পরবর্তীতে মাওলানা উবায়দুল্লাহ!

হিজরি ১২৬০ এর সময়। মাওলানা উবায়দুল্লাহ চিন্তা করলেন, পৈত্রিক ধর্ম ও আমার ধর্মের মাঝে পার্থক্য, অসাড়তা এবং যৌক্তিকতাটা কোথায় তা তুলে ধরতে হবে। নয়ত পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করে সত্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার মাজেযা কোথায়, তা প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে যাবে। এই দুটি ধর্ম নিয়ে লেখার ফলে হিন্দুরা যেমন জানতে পারবে ইসলাম সম্পর্কে, বুঝতে পারবে এর শ্রেষ্ঠত্ব, তেমনি মুসলিমরাও উপলব্ধি করতে পারবে 'ইন্নাদ্দীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলামে'র মর্মবাণী!

সেই ভাবনা থেকে ১২৬৮ হিজরিতে তিনি লিখে ফেললেন তুহফাতুল হিন্দ। ১২৬৮ থেকে ১২৭৮ এর মধ্যেই বইটির চার চারটি সংস্করণ ছাপা হয়েছে। ছাপা ও প্রেসের এই চরমোৎকর্ষের যুগে যেখানে এক দুইটি সংস্করণ প্রকাশ করতে বহুবছর কেটে যায়, সেখানে আজ থেকে ১৭০ বছর পূর্বেকার ছাপাখানায় মাত্র ১০ বছরে ছাপা হয়েছিল এই বইটির চার চারটি সংস্করণ!

মূল গ্রন্থে প্রবেশের পূর্বে তিনি দাঈদের প্রতি অর্থবহ কিছু 'অনুরোধ' রেখেছেন, যা একজন দাঈ অনুরোধ হিসেবে না নিয়ে বরং শিরোধার্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ। দুদিন আগে পাবলিক লাইব্রেরিতে সাইন্স ফিকশন ফেস্টিভ্যালের পিছনে বসে যখন এক ভার্সিটি স্টুডেন্টের ধর্ম কেন্দ্রিক সংশয় ও দ্বিধা-সন্দেহ দূর করার জন্য কথা বলে যাচ্ছিলাম, উপলব্ধি করেছি অবচেতন মন কীভাবে তার 'অনুরোধগুলো'কে কাজে লাগিয়ে পরিণতিতে পৌঁছেছে। মূল বইয়ে প্রবেশের পূর্বে তাই 'অনুরোধগুলো' আত্মস্থ করে নেয়া উচিৎ।

এবার আসি মূল বইয়ে। লেখক মোট পাঁচটি অধ্যায়ে বইটি সাজিয়েছেন, যার একটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে অন্যটির সাথে সম্পৃক্ত। প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে। ইসলাম ধর্মে আকীদার অবস্থা-অবস্থান ও সংক্ষিপ্ত মৌলিক বিবরণ, এবং হিন্দু ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস ও তাদের মোটামুটি বিস্তারিত বিবরণ তিনি এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন।

প্রথম অধ্যায়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ে পাঠক হিন্দু ধর্মের মৌলিক অনেক তথ্য ও তত্ত্ব জানতে পারবেন। এই অধ্যায়টিকে লেখক মোট ৮টি প্রসঙ্গে ভাগ করেছেন।

১. প্রভুর পরিচয়। ২. অবতার সমীক্ষা। ৩. আসমানি গ্রন্থ। ৪. পথ নির্দেশের জন্য আদিষ্ট ব্যক্তি। ৫. মহাপ্রলয়। ৬. উপাস্য। ৭. মাযহাবগত ভিন্নতা এবং ৮. দাওয়াত, এই আটটি প্রসঙ্গে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক আলোচনা করেছেন ধর্মের বিধি-বিধান বা আহকাম সম্পর্কে। এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন মোট ছয়টি প্রসঙ্গ নিয়ে।

১. পবিত্রতা-অপবিত্রতা। ২. উপাসনা বা নামাজ। ৩. রোজা বা উপবাস। ৪. সদকা বা উৎসর্গ। ৫. হজ বা তীর্থগমণ এবং ৬. পূণ্য প্রেরণ বা ইসালে সওয়াব।

তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক আলোচনা করেছেন সামাজিকে রীতি-নীতি সম্পর্কে। এখানেও ছয়টি প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। ১. বিবাহ ও বিবাহচ্ছেদ। ২. হালাল-হারাম। ৩. সাক্ষাতের শিষ্টাচার। ৪. উদ্বোধন। ৫. পেশা ও বংশকৌলীন্য এবং ৬. বিচার ও ন্যায়পরায়ণতা।

চতুর্থ অধ্যায়ে লেখক হিন্দুদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও আপত্তির সন্তোষজনক ও চমৎকার উত্তর দিয়েছেন। যা একজন দাঈকে একজন হিন্দুধর্মাবলম্বীর সাথে কথা বলার সময় সাহস ও আত্মবিশ্বাস যোগাবে। নিজের ধর্ম সম্পর্কে তৈরি হবে স্বচ্ছ ধারণা।

এই চার অধ্যায়ে লেখক হিন্দু ধর্মের অসাড়তা ও ইসলাম ধর্মের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন যৌক্তিকভাবে। সাম্প্রদায়িকতা ও পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে উঠে সত্যানুসন্ধিৎসা নিয়া অধ্যয়নকারী পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন যৌক্তিকতা ও বিবেকের আলোকে ইসলাম ধর্মই শ্রেষ্ঠ। পাঠকের মধ্যে যৌক্তিকভাবে এই উপলব্ধিটি সৃষ্টির পরই লেখক পঞ্চম অধ্যায়টি রচনা করেছেন ইসলামের সৌন্দর্য নিয়ে। ইসলামের অসংখ্য সৌন্দর্যের মধ্য থেকে লেখক পনেরটি বিষয় উত্থাপন করেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে।

এটা সর্বজন বিদিত যে, ধর্মের প্রায়োগিক ক্ষেত্রকে মোট পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। আকায়েদ, মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাক। সুনিপুণভাবে সংক্ষিপ্তাকারে লেখক এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই দুই ধর্মের ব্যবধান ও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। বাই বর্ন মুসলিম হওয়ার কারণে মৌখিকভাবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলেও আমরা আসলেই জানিনা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের দিক ও সৌন্দর্যগুলো কী কী! এই বইটি যতটা না হিন্দুধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য, তারচে বেশি ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার জন্য পাঠ করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য একান্ত আবশ্যক আমাদের জন্য।

বই
সনাতন হিন্দুধর্ম ও ইসলাম [যুক্তি ও প্রমাণ্যতার নিরিখে]
মূল- তুহফাতুল হিন্দ।
লেখক- মাওলানা উবায়দুল্লাহ মালিরকোটলায়ী রহঃ
অনুবাদ- আব্দুল্লাহ আল ফারুক
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২৪
মুদ্রিত মূল্য : ২৪০
বাঁধাই ধরন : হার্ড ব্যাক
প্রকাশনায়- Maktabatul Hasan
বিষয়বস্তুঃ হিন্দুধর্ম ও ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক ও তাত্ত্বিক আলোচনা।
রিভিউ লেখক: মাহমুদ সিদ্দিকী

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.